রেজাল্ট বের হওয়ার পর থেকে নিশ্চয়ই তোমার বাড়ির চারপাশে দুই ধরনের হাওয়া বইছে।
এক দল মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে ঘুরছে, ফেসবুকে বড় বড় পোস্টে জিপিএ-৫ আর গোল্ডেনের বন্যা ভেসে যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজন ফোন দিয়ে মিষ্টির দাম কত জানতে চাইছে না, জানতে চাইছে তোমার জিপিএ কত।
আর অন্য দল? তারা ঘরের কোণে চুপচাপ বসে আছে। ফোনটা বন্ধ, চোখ দুটো হয়তো লাল, আর বুকের ভেতর একটা ভীষণ ভারি পাথর চেপে বসে আছে।
তুমি যদি সেই প্রথম দলে হও—তাহলে মন থেকে অনেক অভিনন্দন। তোমার কষ্ট আর পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। আর তুমি যদি সেই দ্বিতীয় দলের একজন হও... অর্থাৎ রেজাল্ট মনের মতো হয়নি, মার্কশিটে 'F' অক্ষরটা চলে এসেছে বা পয়েন্ট পড়ে গেছে—তবে তোমার জন্য রইলো আমার পক্ষ থেকে “এক বালতি সমবেদনা”।
না, আমি তোমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছি না। সত্যিই, এক বালতি সমবেদনা। কারণ এই মুহূর্তে তোমার ভেতর দিয়ে কী ঝড় যাচ্ছে, সেটা কোনো মোটিভেশনাল স্পিকারের অমূল্য বাণী দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আত্মীয়দের কটু কথা, বাবা-মার ফ্যাকাশে মুখ, বন্ধুদের হাসি মুখগুলোর সামনে নিজের লজ্জা—সব মিলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক, “আমার জীবনটাই বুঝি শেষ হয়ে গেল!”
কিন্তু দাঁড়াও... কান্নাকাটি বা সমবেদনার হিসাবটা একটু পাশে সরিয়ে রেখে আগে দু-তিনজন মানুষের একটা সংক্ষিপ্ত গল্প শুনে যাও।
কয়েকজন মানুষ, যাদের গল্প একটু অন্যরকম
আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি—পড়াশোনায় খারাপ করলে জীবনে কিচ্ছু হতে পারবি না। কিন্তু ইতিহাস একটু অন্য কথা বলে।
প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় ধাক্কা খাওয়ার অভিজ্ঞতা
অনেকে বানিয়ে বানিয়ে বলে আইনস্টাইন নাকি স্কুলে অঙ্কে ফেল করতেন। কথাটা একদম ভুল। আইনস্টাইন ছোটবেলা থেকেই অঙ্কে অসাধারণ ছিলেন। কিন্তু আসল ঘটনা হলো, ১৬ বছর বয়সে যখন তিনি বিখ্যাত সুইস ফেডারেল পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেন, তখন তিনি কিন্তু প্রথমবারে বিজ্ঞান (Science) বিষয়গুলো ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে অকৃতকার্য হয়েছিলেন। বিজ্ঞান ও অঙ্কে সর্বোচ্চ নম্বর পেলেও ভর্তি হতে পারেননি। তাকে আবার প্রস্তুতি নিয়ে পরের বছর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢুকতে হয়েছিল। দুনিয়ার সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষটির জীবনেও ভর্তি (Entrance) পরীক্ষায় ধাক্কা খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল।
স্কুলের শিক্ষকের চোখে পড়াশোনার 'অযোগ্য'
এডুকেশন সিস্টেমে এডিসন এতটাই বেমানান ছিলেন যে, তার স্কুলের শিক্ষক তাকে 'নন-টিচেবল' বা পড়াশোনার অযোগ্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। মাত্র ৩ মাস স্কুলে যাওয়ার পর তার মা তাকে বাসায় এনে নিজের মতো শেখানো শুরু করেন। এডিসন যদি সেই স্কুলের শিক্ষকের মূল্যায়নে আটকে থাকতেন, তবে হয়তো আমাদের আজকের রাতের আলোর রূপ অন্যরকম হতো।
হাইস্কুল টিম থেকে বাদ পড়ে কবাটের পেছনে লুকিয়ে কান্না
স্পোর্টসের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা বাস্কেটবল খেলোয়াড় বলা হয় মাইকেল জর্ডানকে। কিন্তু হাইস্কুলের ১০ম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্কুলের মেইন বাস্কেটবল টিম থেকে তাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দল থেকে বাদ পড়ে তিনি ঘরে এসে কবাটের পেছনে লুকিয়ে কেঁদেছিলেন। কিন্তু তিনি খেলা ছেড়ে দেননি। সেই বাদ পড়াটাই তাকে আরও বেশি অনুশীলন করতে বাধ্য করেছিল।
এই মানুষগুলোর গল্প শোনানোর উদ্দেশ্য কিন্তু এটা নয় যে, “দেখো, উনারাও পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন, তাই তোমারও পড়ার দরকার নেই!” আসল বিষয় হলো: একটি সেটব্যাক বা একটি অকৃতকার্যতার দাগ দিয়ে কোনো মানুষের জীবনের শেষ চ্যাপ্টার লেখা যায় না।
চিত্র: SSC রেজাল্ট খারাপ মানেই পথচলা শেষ নয়, এটি ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন সূচনা
হাসি বাদ দিয়ে এবার সত্যি কথা
আচ্ছা, এবার একটু তামাশা আর ইতিহাস বাদ দিই। একদম খোলামেলা সোজা কথা বলি। সত্যি করে নিজের মনকে একটা প্রশ্ন করো তো— আজ এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছো বা রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলে কি তুমি ব্যর্থ একজন মানুষ?
উত্তর হলো: না। একদমই না।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তোমার মনে হতেই পারে, “বন্ধুরা সবাই ভালো কলেজে ভর্তি হবে, আর আমি পিছিয়ে গেলাম।” আত্মীয়রা ফোন দিলে আম্মু মিথ্যা বলছে বা কাঁদো কাঁদো গলায় কথা বলছে, আব্বুর মুখটা থমথমে। মনের ভেতর বারবার ঘুরেফিরে আসছে—এখন মানুষের সামনে মুখ দেখাবো কীভাবে?
এই লজ্জা, এই ভয়, এই অপরাধবোধগুলো ভীষণ সত্যি। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় একটা কথা বোঝার চেষ্টা করো। তোমার এই এসএসসি রেজাল্ট শিট বা মার্কশিটটার মধ্যে কিন্তু তোমার রোল নাম্বার, কিছু বিষয় আর কিছু নম্বর লেখা আছে।
ওটার মধ্যে কিন্তু তোমার পুরো জীবনের মেধা, তোমার সততা, তোমার ভেতরের সৃজনশীলতা, তোমার ধৈর্য কিংবা তোমার ৫০ বছর পরের ভবিষ্যতের কোনো সিল মারা নেই। একটা ৩ ঘণ্টার পরীক্ষা আর খাতা দেখার কয়েকটা দাগ দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়—তুমি মানুষ হিসেবে ভবিষ্যতে কতদূর যাবে।
একজন শিক্ষক হিসেবে একটা কথা
শিক্ষকতা ও অভিজ্ঞতার এই জীবনে কত শত শত শিক্ষার্থী দেখলাম। কত ছাত্রকে দেখেছি এসএসসিতে গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়ে কলেজে গিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে। আবার এমন অনেক ছাত্রকেও দেখেছি, যারা এসএসসিতে এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছিল। সেই ধাক্কাটা খেয়ে তাদের ঘুম ভেঙেছিল। তারা নতুন করে শুরু করেছিল, পরবর্তীতে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, সফল ক্যারিয়ার গড়েছে, এমনকি আজ সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত।
শিক্ষকের মূল বার্তা:
যে ছাত্রটা রেজাল্ট পাওয়ার পর ভেঙে পড়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, সমস্যাটা রেজাল্টে নয়, সমস্যা তৈরি হয় তার থমকে যাওয়ায়। আর যে শিক্ষার্থী এই আঘাতটাকে একটা 'ওঐেক-আপ কল' বা শিক্ষা হিসেবে নেয়, তাকে কেউ ধরে রাখতে পারে না।
এখন কী করবে? (বাস্তব কিছু পদক্ষেপ)
ফেল করার পর কেবল রুমে দরজা বন্ধ করে কাঁদা বা ডিপ্রেশনের পোস্ট দেওয়া কোনো সমাধান নয়। কান্না আসলে কেঁদে নাও, কষ্টটা বের হয়ে যাক। কিন্তু তারপর উঠে দাঁড়াতে হবে। কী করা উচিত এই মুহূর্তে?
-
১
সত্যিটা মেনে নাও: কাদামাখা চোখ নিয়ে অজুহাত খোঁজা বন্ধ করো। “টিচার খাতা বাজেভাবে দেখেছে” বা “প্রশ্ন কঠিন ছিল” বলে মনকে সান্ত্বনা না দিয়ে মেনে নাও যে কোথাও তোমার প্রস্তুতিতে ভুল ছিল। একসেপ্টেন্স হলো ঘুরে দাঁড়ানোর ১ম ধাপ।
-
২
ভুলের ময়নাতদন্ত করো: কোন বিষয়ে পয়েন্ট কমলো? কোন বিষয়টায় ফেল আসলো? কেন এমন হলো? পড়ার সময়ে গাফিলতি ছিল, নাকি পরীক্ষার হলে লেখায় ভুল হয়েছিল? চিহ্নিত করো।
-
৩
বাবা-মার সাথে খোলামেলা কথা বলো: তারা এই মুহূর্তে হয়তো রাগে বা কষ্টে আছেন। কিন্তু বিশ্বাস করো, দুনিয়ায় তোমার ভালো তারা ছাড়া আর কেউ সত্যি চায় না। তাদের সামনে গিয়ে সোজা বলো—"আমার ভুল হয়েছে। আমি কষ্ট পেয়েছি, তোমাদেরও কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু আমি আবার পরীক্ষা দেবো এবং এবার নিজেকে প্রমাণ করবো।"
-
৪
সাপ্লিমেন্টারি বা পুনঃনিরীক্ষণ (Board Challenge): যদি মনে হয় খাতা পুনর্মূল্যায়ন করলে রেজাল্ট বদলাতে পারে, তবে সময়মতো বোর্ড চ্যালেঞ্জ করো। আর যদি পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়, তবে আজ থেকেই নতুন সিলেবাস আর পড়ার রুটিন তৈরি করো।
-
৫
নিজের তুলনা বন্ধ করো: ফেসবুকে কে কোন কলেজে ভর্তি হচ্ছে, কার রেজাল্ট কী হলো—এগুলো দেখা আপাতত বন্ধ রাখো। প্রয়োজনে কয়েকটা দিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ব্রেক নাও। তোমার যুদ্ধটা তোমার নিজের সাথে, বন্ধুর সাথে নয়।
চিত্র: আত্মবিশ্বাস ও স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন
জীবনের ক্যানভাস অনেক বড়: প্র্যাকটিক্যাল স্কিলের গুরুত্ব
এসএসসি পার হওয়ার পর তুমি কিন্তু একটু একটু করে বড়দের দুনিয়ায় পা রাখছো। আর বড়দের দুনিয়ার একটা খোলা সত্য হলো—শুধু বইয়ের সার্টিফিকেট দিয়ে এখন আর ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে না।
তোমার একাডেমিক পড়াশোনা আর রি-টেস্টের প্রস্তুতির পাশাপাশি নিজের দক্ষতার দিকে নজর দাও। ডিজিটাল এই যুগে প্র্যাকটিক্যাল স্কিলের কদর যেকোনো সার্টিফিকেটের চেয়ে অনেক বেশি।
তোমার কি প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ আছে? কোডিং, ওয়েবসাইট তৈরি, গ্রাফিক্স ডিজাইন বা অন্যান্য ডিজিটাল টুলসের কাজ তোমাকে টানে? তাহলে সময় নষ্ট না করে খুব সাধারণ কিছু স্কিল শেখা শুরু করতে পারো।
বর্তমানে Dremoy-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ওয়েব ডেভলপমেন্ট এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও সেবা পাওয়া যায়। পড়াশোনার পাশাপাশি এমন কোনো একটি টেকনিক্যাল স্কিল যদি তুমি একটু একটু করে রক্তস্থ করতে পারো, তবে আগামী ৩-৪ বছর পর দেখবে—এইচএসসি বা কলেজের রেজাল্ট যাই হোক না কেন, তুমি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো সক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছো।
পড়াশোনার পাশাপাশি প্র্যাকটিক্যাল আইটি স্কিল শিখতে চাও?
Dremoy IT-এর প্রফেশনাল কোর্স ও মেন্টরশিপের মাধ্যমে আজই শুরু করো তোমার টেক জার্নি। গ্রাফিক্স ডিজাইন, বেসিক কম্পিউটার ও প্র্যাকটিক্যাল আইটি স্কিলে নিজেকে এগিয়ে রাখো।
শেষ কথা
আজ তুমি হেরেছো। কিন্তু খেলা কিন্তু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
রেজাল্টের কাগজটা তোমার হাতে শুধু একটা সংখ্যা বা কিছু অক্ষরের হিসাব ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তোমার জীবনের আসল চ্যাপ্টারটা তুমি কীভাবে লিখবে—সেই কলমটা কিন্তু এখনও তোমার নিজের হাতেই আছে।
আজকের এই 'এক বালতি সমবেদনা' কাল যেন তোমার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিতে পরিণত হয়।
পড়াশোনায় মনোযোগ দাও, নিজের স্কিল বাড়াও, আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। তোমাকে দিয়ে হবে। গল্পটা কেবল শুরু হলো!